
ঢাকা: রাজধানীসহ সারাদেশে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত কোনো শয্যাই এখন খালি নেই। ৬০টি বিশেষায়িত শয্যার বিপরীতে গতকাল রোববার পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৭১ জন শিশু।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিশেষায়িত ওয়ার্ড ছাড়াও একক কেবিন ও আইসোলেশন ওয়ার্ডে হামের রোগীদের জায়গা দিতে হচ্ছে।
ভর্তি ও মৃত্যু: চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত এই হাসপাতালে হাম নিয়ে ভর্তি হয়েছে ১৮৭ জন শিশু। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
আইসিইউ পরিস্থিতি: হাম ওয়ার্ডের ভেতরে ১৬ শয্যার আইসিইউর মধ্যে ১৪টিতেই রোগী ভর্তি আছে। এর মধ্যে একজন শিশু লাইফ সাপোর্টে এবং আরও একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান: ভর্তি হওয়া ১৮৭ শিশুর মধ্যে ১১৮ জনের বয়সই ৯ মাসের কম। ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুর সংখ্যা মাত্র ৮টি।
ল্যাব টেস্ট: ৭৭ জন শিশুর রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছিল, যার মধ্যে ৬৬টির রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এই ৬৬ জনের মধ্যে ৩৫ জনের শরীরেই হামের অ্যান্টিবডি পজিটিভ এসেছে।
হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে সরেজমিনে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। সিরাজগঞ্জ থেকে আসা ৭ মাস বয়সী রাইয়ান কিংবা টাঙ্গাইল থেকে আসা ২ বছর বয়সী মীর মোহাম্মদ—সবার শরীরেই ফুটে উঠেছে হামের ভয়াবহতা। কারও নাকে নল, কারও হাতে বা মাথায় ক্যানুলা। শ্বাসকষ্ট আর তীব্র জ্বরে ছটফট করছে শিশুরা। অনেক বাবা-মা অভিযোগ করছেন, অন্য রোগের চিকিৎসা করতে এসে হাসপাতাল থেকেই তাদের সন্তান হামে আক্রান্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল হক জানিয়েছেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখা ছাড়া উপায় নেই। তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন:
১. জনসমাগম এড়িয়ে চলা: শিশুদের নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভিড়ে যাওয়া একদম বন্ধ করতে হবে। ২. স্কুলে না পাঠানো: শিশুর জ্বর, সর্দি, কাশি বা চোখ লাল হলে তাকে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত স্কুলে পাঠানো যাবে না। ৩. শ্বাসকষ্টে সতর্কতা: শিশু যদি স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত বা অস্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেয়, তবে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। ৪. পুষ্টি ও যত্ন: হাম হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল ও প্রচুর তরল খাবার খাওয়াতে হবে। ৫. সুরক্ষা: আক্রান্ত শিশুর আশপাশে থাকা অভিভাবকদের অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, প্রতিদিন সুস্থ হয়ে কিছু শিশু বাড়ি ফিরলেও নতুন রোগীর চাপে শয্যা সংকট প্রকট হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিভাবকদের সচেতনতার ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।